অরগানিক তেল! জেনে নিন অরগানিক তেল তৈরির ৫ টি ঘরোয়া পদ্ধতি

অরগানিক তেল! জেনে নিন অরগানিক তেল তৈরির ৫ টি ঘরোয়া পদ্ধতি :  

" চুল তার  কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা
   মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য;
    অতিদূর সমুদ্রের পর 
   হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা।। " 


  জীবনানন্দ দাশের এই কবিতা থেকে বোঝা যায় নারীর সৌন্দর্যের বর্ণনায় ঘন, কালো, রেশমী, উজ্জ্বল চুলের কদর সব কালেই ছিলো, আছে, এবং থাকবে। আর চুল পরিচর্চায় তেল একটি অপরিহার্য উপাদান।কথায় আছে যে, "   তেলে চুল তাজা "। তেল শুধু চুলেরই নয় ত্বকের জন্য ও উপকার। তেল ত্বকের ময়শ্চারাইজার হিসাবেও কাজ করে।আমরা অতি সহজে ঘরে বসেই ঘরোয়া উপায়ে তৈরি করে নিতে পারি বিভিন্ন রকমের অরগানিক তেল। 
নিম্ন এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা করা হল ও তৈরির পদ্ধতি দেয়া হল :

বিশুদ্ধ নারকেল তেল তৈরির পদ্ধতি : 
 চুলের যত্নে নারকেল তেলের ব্যবহার যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে।এতে রয়েছে ফাইবার, খনিজ পদার্থ ও ভিটামিন। যা আমাদের ত্বক ও চুলের জন্য খুবই উপকারী। আর এই তেল আমরা ঘরেই  তৈরি করে নিতে পারি।
পদ্ধতি :  ২টি নারিকেল ও ৫ কাপ পানি এই ২ টি উপকরন দিয়েই তৈরি হয় বিশুদ্ধ নারকেল তেল।নারিকেল ও পানি এক সাথে মিশিয়ে চুলায় মিডিয়াম আঁচে জাল দিতে হবে।জাল দেয়া হয়ে গেলে নামিয়ে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে    একটি পএে ঢেলে নিতে হবে।এবার প্লাস্টিকের রেপার বা ডাকনা দিয়ে ডেকে ৮/১০ ঘন্টার জন্য ফ্রিজে রেখে দিতে হবে।তারপর ফ্রিজ থেকে নামিয়ে নিলে দেখা যাবে পানির উপরের অংশটি জমাট বেঁধে উপরে একটা শক্ত লেয়ারের মত হবে।এই শক্ত লেয়ারটা ছেঁকে নিয়ে চুলায় আবার জালে বসাতে হবে। ঘন ঘন নারতে হবে। আস্তে আস্ত তেল বের হয়ে আসবে। এরপর নামিয়ে ঠান্ডা করে ছেঁকে জারে ঢেলে নিতে হবে। 
উপকারিতা : এই তেল চুলের গোরা শক্ত করে, চুলকে ময়েশ্চারাইজ করে।নারকেল তেল ত্বকের জন্যও উপকারী।এই তেলের ব্যবহার ত্বকে বয়সের ছাপও দূর করে।ত্বকের খসখস ভাব  দূর করার জন্য ও বলিরেখা দূর করার জন্য এই তেল ব্যবহার করা হয়।কেটে গেলে বা পুরে গেলে নারকেল তেল ব্যবহার করা হয়।

বাদাম তেল তৈরির পদ্ধতি : বাদাম তেল চুলের তো অবশ্যই, ত্বকের জন্যও ভিষন উপকারী। এতে রয়েছে ভিটামিন ই, ক্যালসিয়াম,ফসফরাস,জিংক,কপার,আয়রন,ও ম্যাগনিসিয়াম।   
পদ্ধতি : কাঠ বাদাম কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে ঘন্টা খানেক।তারপর এই বাদামের পেষ্ট তৈরি করে নিতে হবে।তারপর এই পেষ্ট চুলায় জাল দিতে হবে মিডিয়াম জালে।বার বার নারতে হবে জাতে নিচে লেগে না যায়।তেল বের হয়ে এলে ছেঁকে নিয়ে জারে ঢেলে নিতে হবে।
উপকারিতা : প্রতিদিন রাতে মেখে ঘন্টা খানেক রেখে পানি দিয়ে ধুয়ে   নিতে হবে।সারা রাত রেখে সকালে ও ধোয়া যায়।তবে যাদের তৈলাকত ত্বক তারা এই তেল ব্যবহারের পর ফ্রেস ওয়াস দিয়ে মুখ ধুয়ে নিতে হবে।এটি রোদে পোড়া দাগ দূর করে, ত্বকের উজ্জ্বলতা বারে।কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকলে এই তেল খেলে উপকার পাওয়া যাবে। হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, রক্ত স্বল্পতা দূর করে,শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা দূর করতে সহায়তা করে।  

পেয়াজের তেল তৈরির পদ্ধতি:পেয়াজ এমনিতেও চুল গজাতে সহায়তা করে তা আমরা কম বেশি জানি। এতে রয়েছে ভিটামিন বি, সি, মিনারেল, ফাইবার, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, সালফার। এর সাথে আরও দিতে হবে রসুন, মেথি গুঁড়া, কারি পাতা দিয়ে এই তেলটি তৈরি করে নিতে হবে।
পদ্ধতি : ২/৩টি বড় পেয়াজ, ১/৪ কাপ রসুন, ১/২ কাপ কারি পাতা, ২ টেবিল চামচ মেথি ২ঘন্টা ভিজিয়ে নিতে হবে। সবগুলো উপকরন একসাথে পেষ্ট করে নিতে হবে। তারপর ১ কাপ নারকেল তেল ও ১ কাপ সরিষার তেল নিয়ে তাতে উপকরনগুলোর পেষ্ট ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে জাল দিতে হবে মিডিয়া আচেঁ এবং ধীরে ধীরে নারতে হবে।তেলে উপকরনগুলো ভাজা হলে একটি সুতির কাপড় নিয়ে তাতে তেল ছেঁকে নিতে হবে।এই তেলে ২ টি ভিটামিন ক্যাপসুল মিশিয়ে নিতে হবে।তৈরি হয়ে গেলো পেয়াজের তেল।তেলটা ছাঁকার পর যা অবশিষ্ট থাকে তা টক দই দিয়ে চুলের  প্যাক হিসাবেও ব্যবহার করা যায়।তেলটি মাথায়১০ বা ১৫ মিনিট ম্যাসাজ করে লাগাতে হবে।২ঘন্টা রেখে ধুয়ে ফেলতে হবে শ্যাম্পু করতে হবে।চাইলে ঔদিনট ও নাধুয়ে রাখা যায়।সপ্তাহে অন্তত ২/৩ বার এই তেলটি লাগাতে হবে। 
উপকারিতা :  পেয়াজে থাকে সালফারল যা চুলকে রিজেনারেট করেও গোড়া শক্ত করে।এতে রয়েছে এন্টি অক্সিজেন যা চুলর সাদা হওয়া রোধ করে।রসুনে রয়েছে এন্টি ব্যকটিরিয়াল উপাদান যা স্কালভকে ব্যাকটিরিয়ার আক্রমন থেকে বাঁচায়।  আরও আছে সেলেনিয়াম যা স্কালভের রক্ত চলাচল বাড়ায়। কারি পাতা চুলের সাদা হওয়া রোধ করে।মেথি স্কালভকে হেলদি করে, খুশকি দূর করে ও চুলকে ময়েশ্চারাইজ করে।সরিষার তেলে আছে ফ্যাটি এসিড যা চুলের গ্রোথ বাড়ায় ও চকমক করে। 

এলোভেরার তেল তৈরির পদ্ধতি : এলোভেরার আরেক নাম হচ্ছে ঘৃতকুমারী। এটি আমাদের চুল ও ত্বকের নানাবিধ উপকার করে। এতে প্রচুর পরিমান ভিটামিন ও মিনারেল আছে যা আমাদের ত্বক ও চুলের জন্য খুবই উপকারী।
পদ্ধতি : বিশুদ্ধ নারকেল তেল নিতে হবে ২৫০ গ্রামও ১ টি বড় এলোভেরা কেটে নিতে হবে উপরের সবুজ আবরন সহ।এবার তেলের মধ্যে এলোভেরার টুকরা গুলো দিয়ে ভালো করে ভাজতে হবে মাঝারি আচেঁ। বাদামীরঙ্গের হয়ে গেলে  এলোভেরা গুলো নামিয়ে ঠান্ডা করে ছেঁকে জারে ভরে নিতে হবে। তেলটা হালকা সবুজ রঙ্গের হবে। এর সাথে ২টা ভিটামিন E ক্যাপসুল মেশাতে হবে। ম্যাসেজ করে চুলে লাগাতে হবে।কম পক্ষে ২ঘন্টা রেখে চুল শ্যাম্পু করে নিতে হবে।
উপকারিতা : এই তেল খুশকি দূর করে, চুল পরা কমায় ও এই তেল ব্যবহারে নতুন চুল গজায়। মাথার উকুন দূর হয়।

নিম তেল তৈরির পদ্ধতি :   এটি একটি ঔষধি গাছ।ত্বক ও চুলের যত্নে নিম ও নিম তেলের তুলোনা হয় না। এটি ত্বকের এলার্জি দূর করে।ভাইরাস ও ব্যাকটিরিয়া নাশে নিম খুবই কার্যকর।এটি একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ।  
পদ্ধতি : নিম পাতা ভালো করে ধুয়ে  ১/২ লিটার তেলে ভিজিয়ে রাখতে হবে প্রায় ২/৩ ঘন্টা। সাথে নিতে হবে ২ টেবিল চামচ মেথি গুড়াঁ।এবার সমস্ত উপকরন এক সাথে নিয়ে মিডিয়াম আঁচে জাল দিতে হবে।এই তেলের সাথে সামান্য সরিষার তেল মিশাতে হবে।তারপর নামিয়ে ছেঁকে জারে ভরে নিতে হবে।
উপকারিতা : এই তেল ব্যবহারে চুলের আগা ভাঙ্গা ও ফাটা দূর হবে।নিমপাতায় রয়েছে ফ্যাটি এসিড যা শুষ্ক চুলকে ময়েশ্চারাইজ করে।ফাঙ্গাল ইনফেকশন দূর করে।এটি চুলকে হাইড্রেড করে ওস্মুথ করে।এটি শুষ্ক চুলের জন্য খুবই উপকার।  এএি ব্রণের সমস্যা দূর করে, কৃমি নাশ করে,রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। নিম পাতা এখন বিভিন্ন প্রসাধনীতে ব্যবহার করা হচ্ছে।  

চুলের যত্নে তেলের ব্যবহার আবশ্যক।নিয়ম করে সপ্তাহে ২/৩ দিন মাথায় তেল লাগাতে হবে।তেল হচ্ছে চুলের খাদ্য।তাই তেল হালকা গরম করে বিলি করে আঙ্গুল দিয়ে চুলের গোরায় ঘষে ঘষে এই তেল লাগাতে হবে।।তাই নিজের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে উপরে বর্ণিত যেকোনো তেল ব্যবহার করে চুলের সঠিক পরিচর্চা ও যত্ন নেয়া এখন খুব সহজ । খুব কম খরচে ও কম সময়ে এই অরগানিক তেল ঘরেই বানিয়ে ফেলা যায়।যেহেতু প্রাকৃতিক উপাদান দিয়েই এই তেল প্রস্তুত করা হয়, তাই এটি চুলের জন্য খুবই উপকার। চুল পরে যাওয়া, চুলের আগা ফাটা,চুল ভাঙ্গা, খুশক,  মাথায় ফাঙ্গাস ইনফেকশন, উকুন ইত্যাদি যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে উপরে বর্নিত তেলগুলো খুবই কার্যকর।

লিখেছেন,
ত্রোপা চক্রবর্তী

No comments

Theme images by konradlew. Powered by Blogger.