ওজন কমানোর সহজ পদ্ধতি


ওজন কমানো কি মুখের কথা? হুম, ওজন কমানো এখন সহজ! আসুন জেনে নেই ওজন কমানোর কিছু সহজ পদ্ধতি:





         "উফ কি মোটা! শরীর তো না গুদাম। কি খায় কে জানে! নরাচরাও করতে পারে না"

 এই রকম কটুক্তিমূলক উক্তি আমরা যারা একটু ওজন বাড়িয়ে ফেলেছি তাদের হয়তো প্রায়ই শুনতে হয়।এতে আমাদের মাঝে কেউ ওজন কমানোর জন্য এটা সেটা করে বা একেবারেই না খেয়ে থাকেন। এতে ওজন কমা তো দূরের কথা আরও ওজন বাড়িয়ে মানসিক অবসাদগ্রস্থ হয়ে পরিএবং এক ধরনের হীনমন্যতায় আক্রান্ত হই। অন্যদিকে এমন ও আছেন যারা ' আমি তো মোটাই। আমার পক্ষে ওজন কমানো সম্ভব না ' এটা ধরে নিয়ে কমানোর চেষ্টাই করেন না। আর ধীরে ধীরে ডায়বেটিস,  উচ্চ রক্তচাপ, প্রেসার সহ আরও নানা রকমের রোগে আক্রান্ত হন। ওজন বৃদ্ধি বিভিন্ন রকমের রোগের কারনও হতে পারে।তাই অতিরিক্ত ওজন আমাদের সবার জন্যই ক্ষতিকর। 
ওজন যেমন একদিনে বাড়েনি তাই এক দিনের কঠিন ডায়েটও তা কমে যাবে না।এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য ও কঠোর শ্রম।একটু পরিশ্রম আর সঠিক পদ্ধতি অনুযায়ী চললে এবং নিয়ম মেনে চললে আমরা যারা মোটা তারা পেতে পারি একটি সুন্দর ও সুগঠিত বডি সেপ আর ওজন তো কমবেই।  
কিভাবে ও কি করলে আমরা আকর্ষনীয় হতে পারি এবং ওজন কমাতে পারি? চলুন  জেনে নেই এই প্রশ্নটির উত্তর : 
    
ওজন কমানোর উপায়:মেটাবলিজম কম বেশি ওজন বাড়া কমার একটি অন্যতম কারন।সাধারনত খাবার থেকে আমরা যে গ্লুকোজ পাই সেটা থেকে শরীর শক্তি নিয়ে থাকে।কিন্তু যে খাবারে গ্লুকোজ নাই আমরা যদি তা খাই তবে শরীর গ্লুকোজ না পেয়ে শরীরের ফ্যাট বার্ণ করবে আর তখনই ওজন কমা শুরু করবে।
সর্বোপরি ওজন কমানের জন্য যা যা করা অবশ্যক তা হলো :
হাঁটা : সকলেরই উচিত প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটা। ৩০/৪৫ মিনিট প্রতিদিন হাঁটলে শরীর ভালো থাকে আর কাজ করার উৎসাহ বাড়ে।ধীরে ধীরে হাঁটার সময় বাড়াতে পারলে আরও ভালো।
তৈলাক্ত খাবার পরিহার করা :ডুবা তেলে ভাজা,  তৈলাক্ত খাবার, বেশি মশলাদার খাবার যেমন : জাঙ্গ ফুড, ঘি, মাখন, বিরিয়ানি, রেড মিট ইত্যাদি  বর্জন করা উচিত।
শর্করা জাতীয় খাবার : শর্করা জাতীয় খাবার যেমন : ভাত, রুটি, আলু ইত্যাদি খাবার খাওয়া কমাতে হবে।এগুলো বেশি খেলে মোটা হবার প্রবোনতা বাড়ে।
মিষ্টি জাতীয় খাবার : মিষ্টি জাতীয় খাবার যেমন : চিনি, গুড়, পায়েস,  মিষ্টি, পেসট্রি কেক, পুডিং, আইসক্রি, চকলেট ইত্যাদি খাবার একে বাড়েই বাদ দিতে হবে।এগিলো আমারের শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ায়। যা আমাদের শরীটের জন্য ক্ষতিকর। 
পরিশ্রম করা:ওজন কমানোর মূল মন্ত্র হলো পরিশ্রম করা।তাই শুয়ে বডে না থেকে পরিশ্রম করতে হবে।বসা কাজ পরিহার করে দাড়িশে কাজ করতে হবে।এক সমীক্ষায় দেখা গেছে দাড়ি্য়ে কাজ করলে ওজন কমে।
পানি পান করা: সকল বয়সের সবাই কে অবশ্যই প্রচুর পানি পান করতে হবে।ডাক্তারদের মতে প্রতিদিন সকালে একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষকে খালি পেটে ৪ গ্লাস পানি পান করা উচিত।আর সারা দিনে প্রায় ৮ গ্লাস পানি পান করতে হবে।
ব্যায়াম করা : আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ব্যায়াম করা আবশ্যক সুস্থ থাকার জন্য।এর মাধ্যমে শরীর সুগঠিত হয় এবং রক্ত চলাচল ভালো হয়।ওজনও দ্রুত কমে।ব্যায়ামের মধ্যে যোগোব্যায়াম খুবই ফলদায়ক ওজন কমানোর জন্য ও মানসিক অবসাদ কাটিয়ে উঠার জন্য।   
নিউট্রিশিয়ানের পরামর্শ নেয়া:ওজন কমানোর দরকার এটা মনে হলেই একজন নিউট্রিশিয়ানকে দেখানো উচিত। তিনিই সাহায্য করতে পারবেন কিভাবে কি খেলে ওজন কমানে সম্ভব।
আঁশ জাতীয় খাবার : আঁশ জাতীয় খাবার যেমন : লাল আটার রুটি, শাঁক সবজি ইত্যাদি খাবার খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
মাতৃত্বকালীন সময়: মাতৃত্বকালীন সময় একজন নারী বিভিন্ন ধরনের খাবার খেয়ে থাকেন আর এটাই তার মোটা হবার কারন হয়ে থাকে।কিন্তু সে সময় সে যদি একজন নিউট্রিশিয়ানের পরামর্শ নেন তবে তার ও তার অনাগত সন্তানের পুষ্টির অভাব ও হবে না এবং নারীটিও ওজন বৃদ্ধির হাত হতে রেহাই পেতে পারেন।
সাঁতার কাটা : সাঁতার কাটা ওজন বৃদ্ধিরোধের আরেকটি অন্যতম কারন। নিয়মিত সাঁতার কাটা ওজন কমানোর উৎকৃষ্ট ব্যায়াম।
সাইকেল চালানো: সাইকেল চালানোর মাধ্যমেও ওজন কমানো যায়।  এটি পেটের মেদ কমায়।
এরোবিক্স :এরোবিক্স বিদেশে ওজন রোধের একটা অন্যতম মাধ্যম।তবে এখন আমাদের দেশেও অনেকেই এরোবিক্সের মাধ্যমে ওজন কমিয়ে থাকেন। 
মেডিটেশন: মেডিটেশন একটি ভালো মাধ্যম ওজন রোধের।এটার মাধ্যমে মানসিক অবসাদ কাটিয়ে উঠে আত্ম নির্ভরশীলতা অর্জন করা যায়। ওজন কমাতে হবে এবং আমি পারবো এটা ভেবে নিজের কাজে মনোনিবেশ করা সম্ভব হয়।
একটু পরিশ্রম করলেই খুব সহজেই ওজন কমানো সম্ভব হয় ঙ৷আর শরীরের মেটাবলিজন বাড়ানো সম্ভব হবে। 

ওজন বাড়ার কারন সমূহ :সবাই শুধু ওজন কমানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে যায়। কিন্তু ওজন কমানোর আগে কেন আমাদের ওজন বাড়ছে তার কারন অনুসন্ধান করে নিতে হবে।তবেই আমরা ওজন কমানোর সঠিক উপায় বেছে নিতে পারবো।চলুন  ওজন বেড়ে যাবার কারনগুলো নির্দিষ্ট করি :


১.অনেকক্ষণ বসে কাজ করা।

২.অতিমাত্রায় ঘুম।

৩.শর্করা জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া।

৪.ডুবা তেলে ভাজা,মসলাদার ও মুখোরচক খাবার খাওয়া।

৫.যে পরিমান খাবার খাওয়া হচ্ছে সে পরিমাণ পরিশ্রম না করলে।

৬.একে বারে না খেয়ে থাকলে।

৭.সময় মত খাওয়া দাওয়া না করলে।

৮.শারীরিক কোন সমস্যা থাকলে।

৯.বংশানুক্রমিক মোটা হবার ধারা থাকলে।

১০.মহিলাদের ক্ষেএে প্রেগন্যানসির সময় ও বাচ্চা হবার পর।ইত্যাদ।  




ওজন কমানোর রুটিন : ওজন কমানোর জন্য ডায়েট শুরু করার আগে তার একটি সুপরিকল্পিত রুটিন তৈরি করে নিলে সুবিধা হবে। তাতে কোন সময় কোন খাবার তা সময় অনুযায়ী খাওয়া সম্ভব হবে।ডায়েট শুরু করার প্রথম পর্যায় যদি শর্করা জাতীয় খাবার গুলো বাদ দেয়া যায় তবে দ্রুত ওজন কমানো সম্ভব।শর্করা জাতীয় খাবার বলতে চাল, গম, মিষ্টি জাতীয় খাবারকেই বোঝানো হয় অর্থাৎ লো শর্করা জাতীয় খাবার, মিডিয়াম প্রোটিন জাতীয় খাবার ও হাই ফ্যাট জাতীয় খাবার খেয়েও ওজন কমানো সম্ভব। অর্থাৎ বিষে বিষক্ষয় করা।ডায়টিং এ প্রতি ২থেকে ৩ ঘন্টা অন্তর খেতে হয়।নিম্নে এই রকম খাবারেরই একটা রুটিন দেয়া হলো:
★★ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস করতে হবে।সকাল সকাল খালি পেটে হাটঁলে তার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন হয় তা শরীর ফ্যাট বার্ণ করে নিয়ে থাকে।আর সকালে হাঁটলে মনও প্রফুল্ল থাকে।
★★কম পক্ষে ৪৫ মিনিট হাঁটার পর এসে থেতো করা আদা ও দারুচিনি দিয়ে সেদ্ধ করা হালকা গরম পানিতে হলুদ মিশিয়ে খেলে পেটের মেদ কমে ও ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ে। এটা ছারা যদি এপেল সাইডার ভিনেগার ১ চামচ, লেবুর রস ১চামচ ও আধা গ্লাস কুসুম গরম পানি খাওয়া যায় এটাও ওজন কমাতে সাহায্য করবে।
★★৮ টা থেকে ৮ঃ৩০ এর মধ্যে সেদ্ধ সবজি অল্প তেলে রান্না করা, এক কাপ গ্রিন টি চিনি ছারা। 
★★১০/১০ঃ৩০টার দিকে একটা সেদ্ধ ডিম।ডিমের সাদা অংশে আছে প্রোটিন আর হলুদ অংশে আছে ফ্যাট। যা আমাদের শরীরের জন্য ভিষন উপকার।  
★★১২টার দিকে একটি দেশি ফল বা সবুজ আপেল বা পেয়ারা, শশা ইত্যাদি।
★★২/৩ টার দিকে এক কাপ ভাত, ১ কাপ সেদ্ধ সবজি, ১/২ টুকরা মাছ বা মাংস,সালাদ, ডাল ১ কাপ।
★★৫:৩০/৬টার দিকে নো ফ্যাট দুধ ১ কাপ বা টক দধি ৩চামচ, সিদ্ধ ছোলা ২ চা চামচ,সালাদ, লেবু।
★★৮/৮:৩০ দুপুরের মতই খাবার বা নিউট্রোশিয়ানিস্ট যদি কোন প্রোটিন ড্রিঙ্ক জাতীয় কিছু দেন সেটা ১ মগ  গরম পানিতে ৪ চা চামচ ভালো করে মিশিয় খেতে হবে।  
★★ রাগ ১২ টার দিকে ১ কাপ লো ফ্যাট দুধ। 
উপরে উল্লেখিত রুটিন অনুযায়ী সারাদিনের খাওয়াকে ভেঙ্গে ৩/ ৪বারের জায়গায় ৯ বার করা হয়েছে যা ওজন কমাতে কার্যকর।




ওজন কমানোর খাবার :প্রতি দিনের রান্নায় ৩ চামচের বেশি তেল ব্যবহার করা যাবে না।।লবন খাওয়া কমা করতে হবে।প্রচুর পানি পান করতে হবে।পেট খালি 
রাখা যাবে না। যে খাবার গুলো খাওয়া উচিত ও উচিত না তা হলো:
★★মিষ্টি জাতীয় ফল যেমন-  আঙ্গুর, পাঁকা পেঁপে, কলা  ইত্যাদি ফল না খেয়ে সিজনাল ও দেশি ফল খেতে হবে।
★★সবজির মধ্যে সবুজ সবজি যেমন: বাধা কপি, ফুল কপি, বিভিন্ন রকমের শাঁক, পটল, কাকরল,পেঁপে, শশা ইত্যাদি খেতে হবে প্রচুর পরিমান। সেদ্ধ করে বা স্যুপ তৈরি করে খাওয়া যেতে পারে। কিছু সবজি আছে  যেমন : কুমরা, গাজর, কঁচু, সকল প্রকার আলু ইত্যাদি না খাই উচিত ডায়েট করার সময়।
★★দুধের তৈরি খাবার যেমন:পিঠা, পায়েস, দুধ চা,মিষ্টি আইসক্রি, চকলেট,পুডিং ইত্যাদি না খাওয়াই ভালো।
★★চর্বি জাতীয় খাবার যেমন:ঘি, মাখন,ডালডা, ম্যাওনেজ,মাংসের চর্বি ইত্যাদি না খাওয়াই ভালো।
★★প্রসেস করা খাবার, প্যাকেট খাবার,টিন খাবার, আচার এগুলো এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।
★★বিভিন্ন রকমের পানীয়  যেমন : হাতে তৈরি ফল ও সবজির শরমত,  লেবুর শরবত ইত্যাদি খেতে হবে কিন্তু বিভিন্ন রকমের কোল্ড ড্রিংস, প্যাকেটজাত জ্যুস ইত্যাদি না খাওয়াই ভালো।
★★আপেল সিডার ভিনিগারে স্বাস্থ্য সম্মত ও এসিডযুক্ত ভিনেগার।এতে আছে ভিটামিন 'এ' ও 'বি', পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস ও আয়রন সমৃদ্ধখনিজ পুষ্টি। যা ওজন কমাতে সহায়ক।
★★ ডিম, সকলরকম মাছ ও মুরগী মাংস খাওয়া যেতে পারে। 

ওজন কমানোর চার্ট : ডায়েট মানে হলো সঠিক পরিমানে সুষম খাবার খাওয়া।ওজন কমানোর চার্ট নিম্নে দেয়া হলো :


খাবার সময়
খাবারের নাম
খাবারের পরিমান
সকাল
ডিমের সাদা অংশ
সবজি সেদ্ধ 
চা/ কফি
২টি
১ বোল
১ কাপ 
মধ্য সকাল
যে কোন ফল
১ টি
দুপুর
ভাত
সেদ্ধ সবজি
মাছ/ মাংস
সালাদ
ডাল
১কাপ
১বোল
২ পিস
১বোল
১বোল
বিকাল
টক দই
ছোলা সেদ্ধ
বা
 দুধ
১কাপ
১কাপ

১কাপ
রাত
দুপুরের মতই বা ভাতের পরিবর্তে রুটি 
দুপুরের মতই কিন্তু আটার রুটি ১টি 


মোট কথায়, ডায়টিং এ পেট যাতে বেশিক্ষণ খালি না থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং এই ভাবে নিয়ম করে খাবার খেলে ওজন তারাতাড়ি কমবে।কিন্তু প্রতি মাসে ২ কেজি ওজন কমানোকে স্বাভাবিক ধরা হয়।সুস্থ থাকার জন্য সঠিক ওজন থাকা আবশ্যক।সেজন্য নিয়মানুবর্তিতা থাকতে হবে ও থাকতে হবে ইচ্ছা শক্তি ও আগ্রহ।


লিখেছেন,
ত্রোপা চক্রবর্তী

1 comment:

  1. স্যার আমি অনলাইনে ওজন কমানোর অনেক পোস্ট পরেছি কিন্তু আপনার মতো করে কেউ লিখতে পারে নি। আমার সমস্ত কনফিউশোন দুর হয়ে গেছে।আপনার সাইট ভিজিট করে আমি খুব উপকৃত হয়েছি।আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

    ReplyDelete

Theme images by konradlew. Powered by Blogger.