হৃদ রোগের আশঙ্কা এড়ানোর সহজ পদ্ধতিগুলো ও খাবারগুলো হলো

 হৃদ রোগের আশঙ্কা এড়ানোর সহজ পদ্ধতিগুলো ও খাবারগুলো হলো 

     হৃদরোগ বর্তমান সময়ে অতি পরিচিত একটি শরীরিক ব্যাধি। এরজন্য বিশৃঙ্খল জীবনযাপন ও খাদ্যাভাসই দায়ী। সুস্থ ও রোগ মুক্ত জীবনযাপনের জন্য সুশৃঙ্খল লাইফস্টাইল ও সুষম এবং পরিমিত খাবার গ্রহণ খুবই দরকারী। বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাই বেশি। হার্ট অ্যাটাক হলেই যে মৃত্যু হয় তা কিন্তু নয়। তবে হার্ট অ্যাটাক হওয়া ঔ ব্যাক্তিকে জানান দেয় যে, সে যে লাইফস্টাইলে চলছে তা মোটেও সঠিক নয়। সেটির পরিবর্তন দরকার। 


  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ( ডি ডব্লিও এইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী হার্ট সংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হওয়া মানুষের মধ্যে ৮৫ শতাংশেরই হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়। সাধারণত রক্তে কোলেস্টরলের মাত্রা বেড়ে গেলে হৃদ রোগ জনিত সমস্যা হয়ে থাকে আর এর থেকে হয় স্টোক। কিছু খাবার রয়েছে যেগুলো আমাদের হৃদরোগ হবার কারন। হৃদপিন্ড রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হলেই হার্ট অ্যাটাক সহ আরও নানা রকম শারীরিক সমস্যা হয়ে থাকে। তাই যেসকল খাবার ও অভ্যাস  হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় সেগুলো জেনে নেই ---


১/আশঁযুক্ত খাবার খাওয়া : 


আঁশ জাতীয় খাবার যেমন - সবুজ শাক সবজি, ছোলা,বিভিন্ন রকম ডাল,  টক ফল, পেয়ারা, আমলকি, কামরাঙ্গা, আমলকি, লেবু ইত্যাদিতে প্রচুর আঁশ রয়েছে  আর এগুলো একজন হার্টের রোগীর প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত।

পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে,  আলু এবং শেকড় জাতীয় সবজি খোসাসহ রান্না করলে সেগুলো থেকেও প্রচুর আঁশ পাওয়া যায়।এছাড়া লাল গম ভেঙ্গে রুটি খেলে আর লাল চালেও প্রচুর আঁশ পাওয়া যায়। 

এই আঁশ জাতীয় খাবারগুলো শরীরে উপকারী ব্যাকটেরিয়া তৈরি করে। আর এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।  


২/লবন কম খাওয়া :


লবন ছাড়া রান্নার স্বাদ চিন্তাই করা যায় না। কিন্তু এই লবন বেশি খাওয়া শরীর জন্য খুবই ক্ষতিকর। হৃদরোগের রোগীদের ডাক্তাররা লবন কম খাওয়ার পরামর্শই দিয়ে থাকেন। লবনে রক্তচাপ বাড়ে ও স্ট্রোকের আশংকা বেড়ে যায়। রান্নায় বেশি লবন, টেস্টিং সল্ট ও খাওয়ার সময় কাঁচা লবন সবটাই পরিহার করা উচিত । 


 ব্রিটেনের স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র এনএইচএস থেকে দেয়া পরামর্শ অনুযায়ী,দিনে সর্বোচ্চ এক চা চামচ পরিমাণ লবণ খাওয়া যেতে পারে । লবন যদিও কেউ একটু বেশি খেয়ে থাকেন আবার কেউ কম। তবে কয়েক সপ্তাহ চেষ্টা করলে লবন কম খাওয়া সম্ভব।


৩/ ওজন কমানো ও ওজন বাড়ে এমন খাবার বাদ দেয়া:

শরীরের ওজন বৃদ্ধি হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক অংশে বাড়িয়ে দেয়। চিনি, চর্বি জাতীয় খাবার, লবন জাতীয় খাবার খেলে আমাদের ওজন বেড়ে যায়। তাই চর্বিযুক্ত খাবার যেমন শর্করা জাতীয় খাবার,  লাল মাংস, ঘি, মাখন,ফাস্ট ফুড, কোল্ড ড্রিংস, মিষ্টি জাতীয় খাবার এগুলো বর্জন করা শরীরের জন্য ভালো। ওজন কমানোর জন্য নিয়মিত পরিশ্রম করা আবশ্যক।


৪/  মিনারেল সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া :


সাধারণত উচ্চরক্তচাপ, কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি, চর্বি জাতীয় খাবার হৃদরোগ হওয়ার এবং স্ট্রোক হবার কারন হতে পারে। তাই এগুলো নিয়ন্ত্রণে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এই ক্ষেত্রে খাবার গ্রহনেও সতর্ক হওয়া উচিত। সে সকল খাবারই খাওয়া উচিত যাতে আছে পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম , ভিটামিন ও খনিজ লবন ইত্যাদি আছে। এগুলো উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে এবং হৃদরোগের মত রোগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তাই আমাদের অধিক পরিমানে মিনারেল ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত।

অনেক খাদ্য বিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ডায়েটের মাধ্যমেই এসব ভিটামিন ও খনিজ উপাদান পাওয়া সম্ভব।

আর এই ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ খাবারগুলো হলো :

★পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া। যেমন - মাছ, আলু ও কলা ইত্যাদি। 

★ম্যাগনেসিয়াম জাতীয় খাবার খাওয়া। যেমন- ★ডাল, হোলগ্রেইন সমৃদ্ধ খাবার। এই সব খাবারে ভিটামিন- বি ও পাওয়া যায়। 

★ক্যালসিয়াম  সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া। যেমন - সবুজ সবজি, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার ইত্যাদি।

★বীজ ও বাদাম জাতীয় খাবার খাওয়া। কারন এতে রয়েছে ভিটামিন-ই।

এগুলো ছাড়াও প্রচুর ফল ও ঘরে বানানো ফলের রস দিয়ে তৈরি জুস ও প্রচুর পানি পান করা উচিত। এই সকল খাবারে প্রচুর ভিটামিন রয়েছে এবং এগুলো শরীরে যথাযথ মিনারেল সরবরাহ করে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। 

  

        

৫/ প্রতিদিন হাঁটার অভ্যাস করা :   


একজন সুস্থ সবল ব্যক্তিরই প্রতিদিন কম পক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করা উচিত। কিছুক্ষণ হাঁটা বা ব্যায়াম করা একজন মানুষকে সারাদিনের জন্য সতেজ করে তুলেএবং সাথে সাথে অনেক রোগ নিরাময়ের কারনও হয়। সকাল বেলাই হাঁটতে হবে এমন কোন কথা নেই বিকেলে বা সন্ধ্যার সময়ও হাঁটার অভ্যাস করা যায়। মুক্ত বাতাসে, খোলা জায়গায় হাঁটলে শরীর ও মন এমনিতেই সতেজ হয়ে যায়। সাইকেলিং, সাঁতার কাটা  খুব ভালো ব্যায়াম শরীর সুস্থ রাখার জন্য। 


৬/ পর্যাপ্ত ঘুম:


প্রতিদিন ৬/৮ ঘন্টা না ঘুমালে শরীরে যে কোন রোগ বাসা বাধঁতে পারে। তাই সুস্থ জীবনের জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় ঘুমানো ও ঘুম থেকে উঠা উচিত। এতে শরীর কর্ম উদীপ্ত হয় ও সতেজও থাকে। আর হৃদয় হয় সুস্থ ও সবল। নির্দিষ্ট সময় পর্যাপ্ত ঘুম ও সময় মত খাওয়া ও পুষ্টিকর সুষম খাবার গ্রহণ করলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।  


৭/ হাসি খুশি থাকা: 


সব সময় হাস্যজ্জ্বল থাকা সকল রোগের এক মহা ঔষধ। আর হৃদরোগের জন্য একটি কার্যকর চিকিৎসা। হাসিখুশি ও প্রানবন্ত থাকাটা শুধু মানুষেকে নিরোগই করে না, করে তোলে প্রানবন্ত। এতে করে মানুষের মনোবল বাড়ে আর যে কোন রোগ যেমন হৃদরোগের মত রোগের সাথে লড়াই করতে সাহস যোগায়।

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এক গবেষণায় বলেছেন, প্রাণবন্ত উপস্থিতি আপনার অবসাদ ও অভ্যন্তরীণ প্রদাহকে ছুটি দিয়ে দেবে এবং অলিন্দ ও নিলয়ের প্রকোষ্ঠকে সুঠাম রাখবে।



৮/ ইয়োগা করার অভ্যাস করা :


  • গবেষণায় ধারনা করা হয় যে ইয়োগা করলে শরীরে ভিটামিন - Y এর সঞ্চার হয়। যা হৃদপিন্ড সুস্থ ও সবল রাখতে সারাসরি সক্রিয় ভূমিকা  রাখে। ৩/৪ মাস নিয়ম করে ইয়োগা করলে যাদের হৃদ স্পন্দনের সমস্যা আছে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত না তাদের সমস্যা কমে যায়। 


## হৃদ রোগের ঝুঁকি কমাতে যে অভ্যাসগুলো বাদ দেয়া উচিত সেগুলো হলো :


★ ধূমপান ও মদ্য পান একেবারেই ত্যাগ করা উচিত।

★ সব রকম নেশা জাতীয় খাবার ত্যাগ করা উচিত।

★চর্বি জাতীয় খাবার খেলে সেই চর্বি রক্তনালীতে জমে হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচলে বাধাঁ সৃষ্টি করে। তাই চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণ না করা।

★কোন প্রকার মানসিক অবসাদ থাকলে তা দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে। 

★ ডায়বেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে।

★ বেশি মশলাদার ও ডুবা তেলে ভাজা খাবার ত্যাগ করা।

★ খাসি ও গরুর মাংস, মাংসের চর্বি, মগজ, কলিজা, ডিমের লাল অংশ, হাঁস ও মুরগীর চামড়া, নারকেল তেল, ডালডা ইত্যাদি চর্বি জাতীয় খাবার বর্জন করা    

 

পুষ্টি ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় বলা হয়েছে যে, মানুষের দেহের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অণুজীব মাইক্রোবায়োম যদি সুস্থ থাকে এবং কোমরের আকার যদি খুব বেশি বেড়ে না যায়, পাশাপাশি রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা কম রাখা যায় তাহলেই হৃদরোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

এগুলোর সাথে ধূমপান সহ বিভিন্ন নেশা জাতীয়,জিনিস থেকে বিরত থাকাও সুস্থ থাকার মূল মন্ত্র।  


সর্বোপরি, কিছু কিছু রোগ নিরব ঘাতকের মত। কখন শরীরে বাসা বাঁধে এবং জটিল আকার ধারন করে তা বোঝাও যায় না। যেমন - হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়বেটিস ইত্যাদি। তাই সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, ব্যায়াম করা ও ডায়েট চার্ট মেনে চলার মাধ্যমে হৃদরোগ সহ আরও অনেক জটিল রোগ এড়িয়ে যাওয়া যায় আর একটি রোগমুক্ত সুস্থ জীবনযাপন সম্ভব হয় । হৃদরোগ হবার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে  সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রার মাধ্যমে হৃদরোগ ঝুঁকি এড়ানো এবং সুস্থ থাকা সম্ভব।


Meta: Hrid roger ashongkha eranor upai


Author: Tropa Chakraborty


No comments

Theme images by chuwy. Powered by Blogger.