গর্ভস্ত সন্তানের সঠিক বৃদ্ধিতে একজন গর্ভবতী মায়ের কি কি খাদ্য গ্রহণ করা উচিত এবং বাদ দেয়া উচিত আসুন জেনে নেই।

 গর্ভস্ত সন্তানের সঠিক বৃদ্ধিতে একজন গর্ভবতী মায়ের কি কি খাদ্য গ্রহণ করা উচিত এবং বাদ দেয়া উচিত আসুন জেনে নেই।


একটি মেয়ের জীবনের পূর্ণতা আসে মা হবার মাধ্যমে। তাই গর্ভকালীন সময়টা একটা মেয়ে নানা রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। অনেক রকম সাবধানতা যেমন অবলম্বন করতে হয় তার সাথে সাথে সচেতনও হতে হয়। এই সময় পুষ্টিকর খাবার খেতে হয়। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি পরিমানে খেতে হয় এই সময়। একজন গর্ভবতী মাকে ঔ খাবারগুলোই খাওয়া উচিত, যা তার এবং তার বাচ্চার পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে। খাবার এমন হওয়া উচিত যাতে গর্ভস্থ বাচ্চার সঠিক ভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করে। যা খেতে ইচ্ছা করবে না তা জোর করে না খাওয়াই ভালো। বরং বিকল্প কিছু খাবার বের করে খাওয়া যেতে পারে। এতে খাওয়ার রুচি নষ্ট হয় না। 



গর্ভবতী একজন মহিলার নিজের প্রতি যত্নশীল হতে হয়। একজন গর্ভবতী মার প্রতিমাসে অন্তত এক কেজি করে হলেও ওজন বাড়া উচিত। কারন এই সময় গর্ভস্থ বাচ্চার জন্যই বেশি বেশি করে খেতে হয়। গর্ভকালীন সময় একজন হবু মাকে নিয়ম করে প্রত্যেক  বেলায় বেলায় খেতে হবে। যেমন - 


সকালে ঘুম থেকে উঠার পর : 


এই সময় প্রায় সবারই ঘুম থেকে সকাল বেলা উঠতে খারাপ লাগে। কারন রাতে ভালো করে ঘুম হয় না গর্ভবতী মায়েদের। তাই সকালে উঠতে ক্লান্ত লাগে। আবার উঠলেও কিছু খেতে ইচ্ছা তো করেই না  বমির বেগও হয়। তাই ভারী খাবার সকালে না খেয়ে এক কাপ চা আর সাথে বিস্কুট খাওয়াই ভালো।


প্রাতরাশ করা :


ঘুম থেকে উঠার বেশ কিছু সময় পর মানে সকালের হালকা খাবার খাওয়ার বেশ কিছু সময় পর সকালের নাস্তা খেতে হবে। নাস্তায় পাউরুটি বা পাতলা আটার রুটি , বেশি করে সবজি, একটা ডিম সেদ্ধ , বাটার ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে। তবে গ্যাসটিকের সমস্যা থাকলে পাউরুটি না খাওয়াই ভালো। ফল বা ফলের জুসও খেতে হবে।


দুপুরের খাবার :


এরপর হলো দুপুরের খাবার। দুপুরে খেতে হবে ভাত ১ বাটি সাথে সবজি, মাছ বা মাংস, ডাল, সালাদ ও খাবার খাওয়ার আধা ঘন্টা পর টক দই খাওয়া যেতে পারে।


বিকালের নাস্তা :


অনেক সময় বিকালে খেতে ইচ্ছা নাও করতে পারে গর্ভবতী মায়ের। তাই এই সময় হালকা কিছু যেমন - এক কাপ চা বা দুধ সাথে বিস্কিট বা ঘরে তৈরি করা কোন স্নেক্স খাওয়া যেতে পারে।


রাতের খাবার : 


শাক ও তিতা ছাড়া দুপুরের মত খাবারই রাতেও খেতে হবে। কারো রুটি খেতে ইচ্ছা করলে ভাতের পরিবর্তে রুটিও খেতে পারেন।


রাতে শোবার আগে : 


রাতে শোবার আগে হালকা ও লিকুইড জাতীয় খাবার খেয়ে নেয়া যায়। যেমন - দুধ ও প্রচুর পানি। কিন্তু চা বা কফি না খাওয়া ভালো এতে ঘুমের সমস্যা হতে পারে।


একজন গর্ভবতী মার নিয়ম করে প্রতিদিন উপরে আলোচিত রুটিনে খাওয়া উচিত। 


এবার আলোচনা করা যাক একজন গর্ভবতী মার কি কি খাবার খাওয়া উচিত, যা তাদের নিজেদের ও বাচ্চার পুষ্টির চাহিদা পূরণ করবে। নিম্নে একজন গর্ভবতী মার কি কি খাবার এই গর্ভকালীন সময় খাওয়া উচিত তা নিয়েই আলোচনা করা হলো -


# গর্ভবতী মার গর্ভকালীন সময় কি কি খাওয়া উচিত :


মাছের তেল : 


মাছের তেলে আছে ওমেগা - ৩ ফ্যাটি এসিড। যা একজন গর্ভবতী মা জন্যও উপকারী এবং গর্ভস্ত বাচ্চার বিকাশেও খুবই কার্যকর। তাই গর্ভবতী মার তৈলাক্ত মাছ খাওয়া জরুরী। মাছের তেল গর্ভাবস্থার জটিলতা দূর করতেও সহায়তা করে।

ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মাছের তেল ক্যাপসুল পাওয়া যায় সেটিও নেয়া যায়। কারন এই সময় অনেক সময় অনেক কিছু খেতে ইচ্ছা করে না। সেক্ষেত্রে এই ক্যাপসুল নেয়া যেতে পারে।    



★ দুধ : 


দুধ সবার জন্যই আদর্শ খাবার।আর গর্ভবতী মাদের জন্য তো খুবই প্রয়োজনীয় এবং উপকারী।তাই একজন গর্ভবতী মার ডেইলী এক গ্লাস ফুল ক্রিম দুধ খাওয়া উচিত। দুধে যে ক্যালসিয়াম রয়েছে শিশুর দৈহিক বিকাশে খুবই উপকার।  


★ ডিম :


প্রোটিন, খনিজ উপাদান ও ভিটামিন সমৃদ্ধ একটি খাবার হলো ডিম। ডিমে যে উপাদানগুলো রয়েছে  তা গর্ভস্থ শিশুর শরীরের কোষ গঠন,বৃদ্ধি, বিকাশ  ও আরও অন্যান্য কারনেও ডিম খাওয়া উচিত গর্ভবতী মার। আর এটি খুবই সহজলভ্য খাবার। অনেক প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারের বিকল্প হিসাবেও ডিম খাওয়া যায়।  


★ মাংস  :


একজন গর্ভবতীর জন্য মাংস খাওয়া  জরুরী। মাংস শরীরের লৌহ ও প্রোটিনের ঘাটতি কমায় শরীরকে সুস্থ রাখে । গর্ভকালীন সময় যে ক্লান্তি হয় তা দূর করে। এই সময় অনেকে মাংস খেতে চান না। সেক্ষেত্রে মাংসকে ফ্রাই করে বা রোজ যেভাবে রান্না হয় তার থেকে আলাদা করে রান্না করে খাওয়া যেতে পারে। 


★ পনির :


দুধ থেকেই তৈরি হয় পনির। তাই দুধের পুষ্টিগুণ ও ক্যালশিয়াম প্রচুর রয়েছে। তাই গর্ভবতীর খাবারের তালিকায় পনির রাখা উচিত। তবে খেতে ইচ্ছা না করলে বাদ দেয়া যেতে পারে।    


★ সবুজ শাক সবজি :


সবুজ শাকসবজি সর্বোবস্থায়, সব বয়সের মানুষের জন্যই খুবই উপকারী। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের জন্য তো খুবই উপকারী   যেমন- ব্রোকলি, মটরশুঁটি, বরবটি, ইত্যাদি নানা রকমের সবুজ সবজি। এসব সবজিতে রয়েছে পটাসিয়া, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রণ, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ইত্যাদি উপাদান যা বাচ্চা ও মার ইমিউন সিস্টেম বৃদ্ধি করে, বাচ্চার ওজন ঠিক রাখে, গর্ভকালীন সময়ে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হয়, এটি দূর করতে সহায়তা করে।      



★ বাদাম ও মাখন :


বাদাম খুবই পরিচিত ও সহজলভ্য একটি খাবার। আর খেতেও দারুণ। এই বাদাম দিয়েও নাখন তৈরি করা যায়। নানা রকমের বাদাম রয়েছে যেমন - কাজু বাদাম, পেস্তা বাদাম, কাঠ বাদাম ইত্যাদি। বাদাম ও নারকেলের সাহায্যে খুবই স্বাস্থ্যকর  মাখন তৈরি করা যায়, যা স্আাস্থের জন্য ও শিশুর মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশের জন্য খুবই উপকারী।    



★ ওটমিল :


কার্বোহাইড্রেট আমাদের শরীরের শক্তি যোগায়। তা একজন গর্ভবতী মার জন্য খুবই  ওটমিল এমন এক ধরনের কার্বোহাইড্রেট যাতে শরীরে শক্তির যোগান হয় কিন্তু কোলেস্টেরলের মাত্রা কম থাকে। ওটমিলে আরও রয়েছে ফসফরাস, সিলিকন, ক্যালসিয়াম সহ আরও অনেক উপাদান। দুধের সাথে মিশিয়ে  খুব সহজে রান্না করে ক্ষিদে পেলে খেয়ে নেয়া যায়। 


★ মিষ্টি আলু :


মিষ্টি আলু হলো মিষ্টি স্বাদ যুক্ত এবং গর্ভস্ত শিশুর জন্য খুবই উপকার। মিষ্টি আলুতে রয়েছে বিটা ক্যারোটিন, ফলিক এসিড, ফাইবার, ভিটামিন-সি সহ আরও অনেক উপাদা। এই উপাদান গুলো মাতৃগর্ভে একটি শিশুর ট্যিসু, কোষের বৃদ্ধি  ও কোন রকম সমস্যা হলে মেরামতেও সহায়তা করে। সেদ্ধ করে, ভেজে নানা উপায়ে মিষ্টিআলু খাওয়া যায়। 

           

★ ফলের রস :


ফল ও ফলের রস খুবই উপকারী স্বাভাবিক মানুষের জন্য আর গর্ভবতীর জন্য তো অবশ্যই।  ফলের মধ্যে রয়েছে নানা রকম ভিটামিন যা একটা শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ।


এগুলো ছাড়াও আরও অনেক রকমের খাবার আছে যা একজন গর্ভবতী মায়ের খাওয়া উচিত গ্রীক, গোটা শস্যের রুটি, আশঁযুক্ত ফল ও শাকসবজি, দই ইত্যাদি আরও অনেক রকম খাবার।  যা গর্ভাবস্থায় খাওয়া উচিত। 


উপরে উল্লেখিত খাবারগুলো অবশ্যই খাওয়া উচিত। এছাড়াও আরও অনেক খাবার আছে যা একজন গর্ভবতী মার খেতে ইচ্ছা করে বা খাওয়া উচিত। মোট কথায় একজন গর্ভবতী মার ঔ সব খাবারই খাওয়া উচিত যা তার খেতে মন চায়।


এছাড়াও এমন কিছু খাবার আছে যা একজন গর্ভবতী মার খাওয়া উচিত নয়। যেমন -  


# গর্ভবতী মার গর্ভাবস্থায় কি কি খাওয়া উচিত না : 


আনারস :


গর্ভাবস্থায় আনারস না খাওয়াই ভালো। বিশেষ করে প্রথম তিন মাস। কারন আনারসে থাকে ব্রোমেলাইন নামক এক প্রকার এনজাইম। যা প্রোটিনকে ভেঙে দিতে পারে এবং জরায়ুতে সংকোচনের সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলস্বরূপ হতে পারে গর্ভপাত। তাই গর্ভকালীন সময় এই ফলটি না খাওয়াই ভালো।


★ পেঁপে : 


প্রচুর প্রোটিন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ হওয়ার পরও একজন গর্ভবতী মাকে পাকা পেঁপে খেতে নিষেধ করা হয়। পেঁপেতে রয়েছে ল্যাক্টেক্স নামক উপাদান। যা জারায়ুকে সংকোচিত করে, কোন কোন সময় রক্তপাতও ঘটতে পারে আবার কোন কোন সময় গর্ভপাতও হতে পারে। গর্ভকালীন সময় পাকা পেঁপে খাওয়া উচিত না। আর প্রথম তিন মাস পেঁপে না খাওয়াই ভালো বিশেষ করে পাকা পেঁপে। কাঁচা পেঁপে কাঁচা খাওয়া কোনভাবেই খাওয়া ঠিক হবে না। তবে ভালো মত সেদ্ধ করে খাওয়া যেতে পারে। তবে গর্ভাবস্থায় পেঁপে খাওয়া  নিয়ে  নানা রকম মতামত রয়েছে।


★কলিজা :


কলিজায় প্রচুর ভিটামিন এ রয়েছে।

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে অতিরিক্ত ভিটামিন-এ যুক্ত খাবার নিষিদ্ধ। কেননা 'ভিটামিন এ' তে রয়েছে টেরাটোজেনিক আর এর প্রভাবে বাচ্চার শারীরিক গঠনগত ত্রুটি হতে পারে। তাই গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে ভিটামিন-এ যুক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।



★ আঙ্গুর : 


গর্ভাবস্থায় সব রকম আঙ্গুরই না খাওয়াই ভালো।আঙ্গুরের মধ্যে যে সকল উপাদান রয়েচে তা একজন গর্ভবতী মার জন্য আঙ্গুর ঠিক নয়। এছাড়াও গর্ভকালীর সময় পরিপাক ক্রিয়া থাকে দুর্বল। তাই আঙ্গুর হজমে সমস্যা হতে পারে এবং ডায়রিয়াও হতে পারে। তাই এই ফল এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।


★ তেঁতুল : 


তেঁতুলের নাম শুনলেই সব টক প্রেমিদের জ্বীভে জল চলে আসে। আর গর্ভাবস্থায় তো সবারই বেশি বেশি টক খেতে ইচ্ছা করে এবং বমি ভাব দূর করতে টকের কোন বিকল্প নাই। তাই তেতুলের কদরও অনেক, সমস্ত টক ফলের মাঝে। কিন্তু গর্ভকালীন সময় বেশি তেঁতুল খাওয়াও ঠিক না। কারন তেতুলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন -সি। এই  ভিটামিন - সি শরীরে প্রজেস্টেরন উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায়। এতে করে গর্ভপাত হতে পারে বা ভ্রুনের কোষের ক্ষতি হতে পারে।



★ অন্যান্য খাবার :


আরও অনেক খাবার রয়েছে যা গর্ভাবস্থায় না খাওয়াই ভালো। এই খাবারগুলো প্রত্যক্ষভাবে ওতটা ক্ষতিকর না হলেও এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।

যেমন : 

 •তারমুজে প্রচুর পরিমানে মিনারেল রয়েছে এবং এর চিনিযুক্ত উপাদানগুলো আমাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে।তাই যেসব গর্ভবতী মায়েদের ডায়বেটিস আছে তাদের না খাওয়াই ভালো। 


•খেজুর অনেক পুষ্টিকর ও ভিটামিন সমৃদ্ধ । এতে প্রচুর ফাইবার রয়েছে।তারপরও এটি ২/১ টার বেশি খাওয়া ঠিক না। আর ডেলিভারির শেষের দিকে খেজুর বেশি খেলে সময়ের আগেই  ডেলিভারি হবার সম্ভাবনা থাকে।    


•হিমায়িত খাবার একজন গর্ভবতী মার এড়ানোই ভালো। তাজা ফল ও সতেজ খাবারই খাওয়া উচিত।


•কাঁচা দুধ, কাঁচা ডিম একজন সুস্থ মানুষেরই খাওয়া উচিত না, গর্ভবতীর তো একেবারেই খাওয়া উচিত নয়। 


মোট কথা, গর্ভকালী সময়টা যেমন আনন্দের তেমনি এই সময় একজন গর্ভবতীকে নিজের সাথে সাথে তার গর্ভস্থ সন্তানেরও খেয়াল রাখতে হয়। যে খাবারই খান না কেন তাতে যেন গর্ভবতী মা নিজে ও সন্তান পুষ্টি  যথাযথ পায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারন এর সাথে গর্ভস্ত সন্তানের বেড়ে উঠা, বিভিন্ন কোষের গঠন ও মস্তিস্কের যথাযথ গঠন নির্ভর করে। একজন সুস্থ মাই পারেন একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে।


Meta: Gorvobotider ki ki khaddo grohon kora uchit,

gorvoboti mayeder khaddo




Author: Tropa Chakrabarty

No comments

Theme images by chuwy. Powered by Blogger.